গল্প

অতীত সীমানা

-শামীম আরা জামান

এই রঞ্জিতা শোন, তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।
সুবল দা কি আর কথা থাকতে পারে? সব কথা শেষ। আর কোন কথা নেই। ক’দিন আছিস তো যশোরে? পরে কথা হবে।
সুবল দা বাড়ি এসো। মা তোমাকে দেখতে চেয়েছে। তোমার বউ বাচ্চাদের নিয়ে এসো।হুমম আসবো।
বাড়ি ফিরে আজ রঞ্জিতা মনটা কেবল অতীত সীমানানায় হাঁটছে। সুবল দা আর আমাদের বাড়িটা ছিলো পাশাপাশি। দু বাড়ির মধ্যে খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিলো। তাই দুজনের মেলামেশায় বাধা নিষেধ ছিলো না। সুবল দা তার তিন ক্লাশ সিনিয়র ছিলো,ছাত্র হিসেবে অনেক ভালো ছিলো।এক সাথে বেড়ে ওঠা, খেলাধুলো সব কিছুতেই একটা সুন্দর পরিবেশ ছিলো চারপাশে।
যশোহর শহরটা খুব সুন্দর ছিলো। আর যে তল্লাটে আমাদের বাড়ি, বনেদি বাড়ি হিসেবে আমাদের দু বাড়ির বেশ নাম ডাক ছিলো। আমি যখন এস এস সি দেবো, তখন সুবল দা বুয়েটে চান্স পেয়ে পড়তে ঢাকা চলে এলো, তার এক বছর আগে থেকেই সুবল দার সাথে আমি দেখা করিনি। এইচ এস সি পাশ করার পর আমার বিয়ে হলো মা বাবার পছন্দে ডাক্তার পাত্রের সাথে আমি চলে গেলাম নেত্রকোনায়। সেখানে স্বামীর পৈত্রিক ক্লিনিকেই থেকে গেলো, সেই সুবাদে আমিও।ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেলো, বাবার ইচ্ছায় ছেলে ডাক্তারি পড়তে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে আর মেয়ে ল’তে পড়ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
জেঠি মা আছো বাড়িতে?
কে রে, ভেতরে আয় বাবা।
আমি সুবল, জেঠি মা।
আয় বাবা, কাছে আয় তোকে ভালো করে দেখি।
সেই যে ঢাকায় পড়তে গেলি আর বুঝি নিজের জন্ম স্থান ভুলে গেলি।
শুনেছি মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিস, খুব বড় ঘরে বিয়ে থা করেছিস, শিক্ষিত, চাকুরি করা মেয়ে।
বউ কে নিয়ে এলি না একটু দেখতাম।ছেলে মেয়ে ক’ জন?
জেঠি মা এক মেয়ে, এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। ওরা আসবে তোমার সাথে দেখা করতে।
কেমন আছিস রে রঞ্জিতা?
ভালো সুবলদা।
তোদের বাড়িটা ঠিক আগের মতোই আছে। সেই উঠোন, বাগান, পুকুর আর সেই ঘরগুলো।
হুম। তোমার বউকে আনলে না যে? তোমার বউ কি জানে আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিলো?
জানে। তুই যখন আমার থেকে মুখ ফেরালি তখন ও আমার পাশে ছিলো।
আজ চলি রে, মেয়েকে নিয়ে বের হবো গ্রাম দেখাতে।
এসো।
বাবা রঞ্জিতা আন্টির বাড়ি নিয়ে যাবে আমাকে?
যাবো তো চলো আগে আমদের গ্রামটা দেখি।
হাটার পথে দেখা হয়ে গেলো, রঞ্জিতার সংগে।
কি অদ্ভুত সুন্দর দেখতে, প্রশান্তির ছায়া যেনো মুখে ভাসে। কে বলে উনি অহংকারী?
উনি যদি অনংকারীও হয়ে থাকেন তবে অহংকারটা তার চেহারার সাথে যায় বাবা।
আমার তো উনাকে অনেক পছন্দ হয়েছে। আহ বাবা কেন যে তোমাদের বিয়েটা হলো না, আমি তার মেয়ে হতে পারিলে গর্ব বোধ করতাম।

দেখেছো সুবল দা আমার অমন একটি মিষ্টি মেয়ে আছে আর আমি কিনা এতোদিন পর দেখলাম।
জড়িয়ে ধরলো। দুজন খুব কথা বলে যাচ্ছে।

সুবল নিজের মধ্যে হারিয়ে গেলো।
আমার সমস্ত কথা স্তব্ধ করে দিয়েছিলো সেদিন, “যেদিন তোমার ভেতরের পশুত্বটাকে টেনে বাইরে নিয়ে এসেছিলে নির্জন দুপুরে আমার বুকের ভেতরে হাত রেখে। সেদিন আমি বুঝে নিয়েছি যাকে নিয়ে আমি এতোকাল স্বপ্নের সেতু পাড়ি দেবো বলে মনের ভেতর একটা ছবি দাঁড় করিয়েছি সে মানুষ তো তুমি নও সুবল দা। আমার আর কিছু বলার ছিলো না, বলবার নেই। তুমি তোমার মতো ভালো থাকো। শুধু অনুরোধ যে তোমার পাশে থাকবে তোমার পাশের মানুষটিকে ঠকিয়োনা।”
আমি কি পূর্ণতাকে ঠকাচ্ছি? কিছুই কি পায়নি আমার মাঝে পূর্ণতা? আমি তো ওর সব চাহিদা
মেটাতে চেষ্টা করি। অভিজা কি তার বাবাকে পছন্দ করছে না। জানি, ওদের সাথে দেখা হয় এক সপ্তাহ পর পর।কারণ পূর্ণতার কাছে টাকা অনেক বড় ফ্যাক্ট। বাড়ি গাড়ি, পার্টি ছাড়া তার জীবনে আর কিছু নেই। শুধু এইটুকু জানি এখনো তোকে ভালোবাসি রঞ্জিতা। সেদিন নির্জন দুপুরের অচেনা আমিটার জন্য আমি সব হারালাম রঞ্জিতা।

Add Comment

Click here to post a comment

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

July 2020
M T W T F S S
« Jun    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031