মতামত

অবক্ষয়ের মাঝে বসবাস

-অনুপম হোসাইন

আমাদের সময়ে আমরা পড়াশুনার পাশাপাশি অনেক কিছুর সাথেই জড়িত থাকতাম। আমি যেমন- আবৃত্তি, বিতর্ক, বক্তৃতা করতাম এবং এগুলোতে অসংখ্যবার জাতীয় পদক পেয়েছি। অসংখ্যবার জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক পেয়েছি। তারপর ব্যাডমিন্টন, সুইমিংয়ে পদক রয়েছে ন্যাশনাল লেভেলে। ক্রিকেট এবং ফুটবলও ভালো খেলতাম। তারপর তো একটি সময় স্পোর্টস মিডিয়ায় সাথে সম্পৃক্ত হই এইচএসসি পাশের পর। পড়াশোনার বাইরে আমরা এতকিছু করেছি যে একটা সময় মনে হতো পড়াশুনাটাই বোধ হয় আমাদের এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটি।

এখনকার সময় স্কুল কলেজগুলোতে দেখা যায় শিক্ষকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঠিকমতো পাঠদান করেন না। তারা ভাবেন যে, ছাত্র-ছাত্রীরা এর ফলে তাদের কাছে প্রাইভেট পড়বে। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সেজন্যই তারা স্কুল-কলেজে যেন-তেন ভাবে ক্লাসের সময়টুকু ব্যয় করেন। কিন্তু আমাদের সময় শিক্ষকদের পুরো ধ্যান-জ্ঞান, চিন্তা-চেতনা জুড়ে ছিলো শিক্ষাদান করা। সেই কারণে এবং সাথে সাথে উপযুক্ত পরিবেশ ও মোটিভেশনের কারণে আমরা তুলনামূলক কম সময় পড়াশুনা করেও অনেক বিষয়ে শিখেছি, অনেক জেনেছি। এই ব্যাপারটা এখন অনুপস্থিত।

আর আরেকটি ব্যাপার অনুপস্থিত সেটা হলো, সেই সময়ের বাবা-মা ‘রা সন্তানকে যেভাবে দিক-নির্দেশনা দিতেন সেটি ছিল অনন্য। এখন যেমন মত যে কোন ভাবে জিপিএ ফাইভ পেতে হবে, না পেলে বাবা-মায়ের প্রেস্টিজ থাকবে না, গোল্ডেন জিপিএ না পেলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না— এইরকম কোনো ব্যাপার মোটেই ছিল না। বাবা-মা ‘রা সব সময় উৎসাহিত করতো সেই সময়টিতে সন্তানকে ভালোভাবে পড়াশুনা করে জানার ব্যাপারে , সত্যিকারের জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে এবং ভালো মানুষ হবার ব্যাপারে।

তখন শিশু-কিশোরদের সংগঠন হিসেবে “খেলাঘর” ছিল, “কচি-কাঁচার মেলা” ছিল। এই সংগঠনগুলিতে অনেক বেশি নিবেদিত প্রান সংগঠক ছিল। তাঁরা তখন চেষ্টা করতো বাচ্চাদেরকে সুকুমার বৃত্তির চর্চার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি করতে। তাদেরকে আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা শিক্ষা দিতে।

তখন আন্তঃস্কুল খেলাধূলা হতো। একটা স্কুল আরেকটা স্কুলকে চ্যালেঞ্জ করতো ফুটবল-ক্রিকেট-বিতর্ক-সাধারণ জ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে। বাচ্চাদের মাঝে ভালো একটি ফুটবল দল বা ক্রিকেট দল গঠনের প্রতিযোগিতা হতো। একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে সব শিক্ষকদের একটা ভালোলাগার জায়গা ছিল ভালো বিতর্ক দল, ফুটবল/ক্রিকেট দল গঠন করা, ভাল একজন আবৃত্তিকার বা এ্যাথলেট তৈরি করা।

এখন তো আমার মনে হয়, স্কুলগুলোতে সেই চর্চা ওইভাবে হয়ই না, হলেও যেন-তেন প্রকারে, লোক দেখানোভাবে।কোন শিক্ষক এগিয়ে এসে এসব দায়িত্ব নিয়ে কাজটি করতে চান না বা সে প্রস্তুতিও তাদের নেই। সবাই কেমন যেন বড়লোক হবার প্রতিযোগিতায় মত্ত। অভিভাবকরাও যেহেতু দুজনেই (বাবা-মা) অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকেন, তাই বাচ্চাদেরকে অতটা সময় দিতে পারেন না কিন্তু মনে-প্রানে আশা করেন যে বাচ্চা গোল্ডেন জিপিএ পাবে এবং সেটা যে কোন প্রকারে। বাচ্চা অন্য ভালো-খারাপ কি শিখলো সেটা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাই শিক্ষকরা যেমন দায়ী, অভিভাবকরাও তেমন দায়ী, ঠিক তেমনিই দায়ী এখনকার পরিবেশ।

এখন স্কুলের সামনে যে পরিবেশ, ভিতরে যে পরিবেশ— এগুলো মোটেই শিক্ষাবান্ধব না। তাই আমার পরামর্শ শুধু অভিভাবকদের জন্য না এটি শিক্ষকদের জন্যও, স্কুল কর্তৃপক্ষের জন্যও। আমি নিজে একজন শিক্ষক, এত পরিচয়ের মাঝেও এই পরিচয়টা দিতেই অনেক অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি আমি কারণ আমার বাবা ছিলেন স্বনামধন্য একজন শিক্ষক এবং আমিও বেশ সুনামের সাথেই অধ্যাপনা করেছি, সেই দাবী নিয়ে আমি বলতে চাই যে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ ভূমিকা পালন করা উচিত এবং চিন্তা করা উচিত শিক্ষাদানটা ধ্যান-জ্ঞান-নেশা এবং পেশা সবকিছুই। অভিভাবক হিসেবে আমাদের একবার ফিরে তাকাতে হবে যে আমরা আমাদের বাচ্চাদের যেভাবে মানুষ করছি বাচ্চাদেরকে যেভাবে দিক-নির্দেশনা দিচ্ছি সেটা কি আদৌ ঠিক আছে? তাই আগের দিনের অভিভাবকরা বাচ্চাদের যেভাবে দিক-নির্দেশনা দিতেন, বাচ্চাকে যেভাবে সময় দিতেন- সেভাবে বাচ্চাদেরকে আমাদের সময় দিতে হবে। দিক-নির্দেশনা দিতে হবে।

অভিভাবক হিসেবে আমরা তখনই সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারবো যদি পড়াশুনার পাশাপাশি বাচ্চাকে নিজে হাতে খেলার মাঠের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। নিজে যদি গান জানেন তাহলে বাচ্চাকে নিয়ে একটু গান করতে পারেন, নিজে যদি আবৃত্তি জানেন বাচ্চাকে নিয়ে একটু আবৃত্তি করতে পারেন, নিজে যদি বক্তৃতা ভালো জানেন বাচ্চাকে একটু এগিয়ে দিতে পারেন কিভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয়। পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান, মার্শাল আর্ট, ছবি আঁকা— এই জিনিসগুলো যদি আপনি করেন পাশাপাশি পড়াশুনার ব্যাপারটিতেও আপনি নিজে কিছুটা দেখলেন শিক্ষকদের উপর কিছুটা নির্ভর করলেন— তাহলেই আপনার সন্তান পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। সমাজে একজন সম্মানিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
অন্যথায় হয়তো ভবিষ্যত প্রজন্ম পুঁথিগত বিদ্যায় ভালো হবে কিন্তু আপনি দেখবেন আপনার সন্তান অন্তঃসারশূন্য অথবা সন্তানের ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি অথবা সন্তানের মাঝে সম্মানবোধের জায়গাটা তৈরি হয়নি মোটেই। সেই ধরনের শিক্ষিত হয়ে কী লাভ?

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

February 2024
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
26272829