গল্প

আলো

সাময়িকী: শুক্র ও শনিবার

-নীপা আকন্দ

“এতো পাড়া বেড়াইতে মানা করি না? শুনোছ না ক্যান?! খালি বাইরে বাইরে ঘুরন! তোর চিন্তায় তো আমি পাগল হইয়া যামু রে” চোখ রাঙিয়ে আলোকে শাসায় সমিরন।

পনেরো বছরের কিশোরী আলো। আলোর মতোই রূপ তার! সমিরনের এখন সবচেয়ে বড় কাজ মেয়েকে সামলেসুমলে ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখা। একেকটা দিন যায় প্রচন্ড উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে। মেয়ে তো কথা শোনে না। বুঝ মানে না।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে রানুদের শিউলীতলায় ছুটে যায় আলো। কোঁচড় ভর্তি শিউলী ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরে মালা গাঁথতে বসে যায়। শিউলী মালা কব্জিতে পেঁচিয়ে রেখে ঘ্রাণ নেয় বারবার। দিনে একবার বাড়ির পাশের ঘরগুলিতে ঢুঁ না মারলে আলোর মন ভালো লাগে না। ক্ষেতের আইল ধরে ছুটে না বেড়ালে দিনটাই ক্যামন প্রাণহীন মনে হয়। স্কুলের বান্ধবীদের সাথে মন খুলে আড্ডা দিতে না পারলে মন খারাপ থাকে। বিন্তি মাসির হাতের তৈরি তিলের নাড়ুর লোভ সামলাতে পারে না। মায়ের শাসন সত্ত্বেও দিনে একবার মাসীর বাড়ি যাওয়া চাই। স্নেহময়ী বিন্তি মাসীও আলোর অপেক্ষায় থাকেন কখন মেয়েটা আসবে তিলের নাড়ু খেতে। সকলের চোখ এড়িয়ে এক কৌটো নাড়ু আলোর জন্য আলাদা করে সরিয়ে রাখে।

মেয়েকে চোখে চোখে আগলে রাখে সমিরন। চোখের আড়াল হলেই পাগলের মতো ডেকে ডেকে হয়রান হয়। সারাদিন ঘরে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসে আলোর। স্কুল বন্ধ যুদ্ধের শুরু থেকে। বান্ধবীদের কারো সাথে দেখা হয় না। কে কেমন আছে কোনো খবর নাই। মায়ের জন্য বাড়ির উঠোন থেকে দুই পা বাইরে যাওয়ার সাধ্য নাই। আলো মন খারাপ করে ঘরের দাওয়ায় বসে থাকে।

মিলিটারিদের লুটপাট সারা গ্রামে। বাড়িবাড়ি তল্লাশী চালিয়ে যখন যাকে সামনে পাচ্ছে দুমদাম গুলি করে মেরে ফেলছে। এর গাছের ডাব ওর পুকুরের মাছ যখন যা ইচ্ছা সাবাড় করে দিচ্ছে। একসঙ্গে আট দশজনকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে খোলা মাঠে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারছে। এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করছে। যখন তখন এর ওর ঘরে আগুন দিচ্ছে। চেয়ারম্যান এখন শান্তি কমিটির মেম্বার। মিলিটারীর দালাল। যুবতী বউ ঝিদের ধরে ধরে মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে রাজাকারের দল। যে যায় আর ফিরে আসে না। মিলিটারীদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার কিশোরী যুবতী। পোয়াতি বউগুলোও রক্ষা পায় না। এসব খবর এখন বাতাসে বাতাসে। আতংকে কাঁপছে সারাটা গ্রাম।

আলোর বান্ধবী নিলু। ওরা বেশ ধনী। গ্রামে ওদের বেশ নাম ডাক। নিলুদের বিশাল বাংলা ঘরে শহর থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছে কয়েকটি পরিবার। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ দাই আদুরী খালা মায়ের সাথে গল্প করছিলো কাল বিকালে ওখানে শহর থেকে আসা একজন পোয়াতির খুব সুন্দর একটা ফুটফুটে বাচ্চা হয়েছে। নাম রেখেছে মুক্তি। ছোট্ট বাচ্চা আলোর খুব ভালো লাগে। কারো ঘরে বাচ্চা হয়েছে এই খবর পেলে আলোকে ঘরে আটকে রাখা যায় না।

রান্নাঘরের পিছন দিকের বাঁশ ঝাড়ের ভিতর দিয়ে কোনরকম শব্দ না করে খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় আলো। নিলুদের বাড়ি এখান থেকে দেখা যায়। পুকুরের ঐ পাড়ে। পুকুরে সাঁতার কাটা হাঁসগুলো আলোকে দেখে প্যাকপ্যাক করে ডেকে উঠলো। ওদেরকে এখন নিজের চেয়ে সুখী মনে হচ্ছে। কোন চিন্তা নেই। কেউ ওদের আগলে রাখে না। শাসায় না। কি স্বাধীন ওরা! পরক্ষণেই মনে হয়, মা তো ভালোর জন্যই শাসন করে। কিন্তু নতুন বাচ্চাটাকে দেখার জন্য মনটা এমন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে! বেশিক্ষণ থাকবে না। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে একটু আদর করেই ফিরে আসবে। ভাবতে ভাবতে আলো পৌঁছে যায় নিলুদের বাংলা ঘরের সামনে।

বান্ধবীকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে নিলু। তারপর কতো যে গল্প। দুই বান্ধবীর অনেক কথা জমে গেছে এই কয়দিনে। কথায় কথায় আলো জানালো, নতুন বাচ্চাটাকে দেখবে বলেই ও এসেছে। নিলুর মা আলোকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললেন। পাটালি গুড় দিয়ে মুড়ি খেতে দিলেন। আলো কিছুই খেলো না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। মা হয়তো এতক্ষণে ওকে খুঁজতে বেরিয়ে গেছে। নিলুকে তাড়া দিয়ে বলে, ‘বাচ্চাটা কই রে নিলু? চল ওর ঘরে যাই।’

ইশ! কি সুন্দর বাচ্চাটা! যেন একটা পুতুল! এতো সুন্দর বাচ্চা আলো জীবনেও দেখেনি। মাথা ভর্তি রেশমের মতো পাতলা মোলায়েম চুল। ঠোঁট দুটো গোলাপী। ক্যামন মায়া মায়া বড় বড় চোখ। শহরের সব বাচ্চা কি এরকম সুন্দর হয়?! বাচ্চাটাকে বুকের মধ্যে আলতো করে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে থাকে কিছুক্ষণ। চুমু খায় গালে। মনেমনে বলে, আল্লাহ আমার বিয়ে হলে যেন এইরকম সুন্দর একটা মেয়ে হয়। ছি ছি! এসব কি ভাবছে! লজ্জা পায় নিজের মনেই। বাচ্চাটাকে নিলুর কোলে দিয়ে বলে, ‘এখন যাই। মা চিন্তা করছে।’ তারপর ভোঁদৌড়।

পুকুর পাড়ে আসতেই আজহারের সামনাসামনি। আলো শুনেছে আজহার রাজাকারের দলে যোগ দিয়েছে। মিটিমিটি হাসছে আলোকে দেখে। ক্যামন গা ঘিনঘিন করে উঠলো। আলো পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলো। পারলো না। আজহার শয়তানটা খপ করে শক্ত মুঠিতে ওর হাত ধরে ফেলে। সঙ্গে আরো তিনজন। আচমকা কালো কাপড়ে আলোর চোখমুখ বেঁধে ফেলে। তারপর পাটক্ষেতের ভিতর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে হাজির করে।

আলোর দিন আর রাত এখন সমান অন্ধকারে ঢাকা!!

 

Add Comment

Click here to post a comment

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

June 2024
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930