ইতিহাস-ঐতিহ্য

ইংরেজরাই মহীশুরের উপাধি দিয়েছিলেন টিপু সুলতানকে

হ্যালোডেস্ক।।  অষ্টাদশ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন শের-ই-মহীশুরখ্যাত টিপু সুলতান। আসলে ইংরেজরাই তাকে মহীশুরের বাঘ উপাধি দিয়েছিল। তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শহীদ রাজা। যদিও তিনি কেমন শাসক ছিলেন তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার তাকে চরম হিন্দুবিদ্বেষী রাজা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। টিপু সুলতান ও তাকে ঘিরে বিতর্ক নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি।

মহীশুর রাজ্য
ভারতের কর্নাটক রাজ্যের আদি নাম ছিল মহীশুর। এই রাজ্যকে নিয়ে ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে নানা কিংবদন্তি। ভারতের দক্ষিণ পশ্চিমে এর অবস্থান। অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন এই রাজ্যের শাসক ও ‘মহীশুরের বাঘ’খ্যাত টিপু সুলতান। তিনিই সর্বপ্রথম স্বাধীন দেশপ্রেমিক যার ভয়ে ভীত ছিল ইংরেজ বাহিনী। ইংরেজরাই তাকে শের-ই-মহীশুর উপাধি দিয়েছিল। টিপু সুলতান আজও অমর হয়ে আছেন ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের অন্তরে।

টিপু সুলতানের বাবা ছিলেন মহীশুর রাজ্যের সেনাপতি হায়দার আলি। সে সময় মহীশুর সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন ওয়াদিয়ার রাজবংশের দুর্বলচিত্তের রাজা কৃষ্ণরাজা ওয়াদিয়ার। তার শাসনামলে মহীশুর রাজ্যটি মারাঠাদের হুমকির মধ্যে ছিল। একই সময়ে ব্রিটিশদের দখলদারিত্ব ও আধিপত্যের লোভ ধেয়ে আসছিল মহীশুরের দিকে। দূরদর্শী হায়দার আলি এই সত্য উপলব্ধি করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন মহীশুরে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার করার। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৬১ সালে হায়দার আলি মহীশুরের প্রকৃত শাসক হয়ে ওঠেন এবং শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রামে কাবেরি নদীর একটি বদ্বীপে নির্মিত দুর্গ থেকে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। টিপু সুলতান তখন ১১ বছরের কিশোর। হায়দার আলির দ্বিতীয় স্ত্রী ফখরুন্নিসা ফাতিমার গর্ভে ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর মহীশুরেই তার জন্ম। টিপু মাস্তান আউলিয়া নামে এক ফকিরের দোয়ায় পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন বলে হায়দার তার ছেলের নামও রাখেন ‘টিপু’।

হায়দার আলি নিজে অশিক্ষিত হলেও বড় ছেলে টিপুকে সুশিক্ষা দেওয়ায় বিশেষ তৎপর ছিলেন। অল্প বয়সেই বেশ কয়েকটি ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন টিপু সুলতান। তলোয়ার চালনায়ও সবার নজর কেড়েছিলেন। হায়দার আলির সঙ্গে ফরাসিদের রাজনৈতিক সুসম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে ছোটবেলাতেই টিপু ফরাসি কর্মকর্তাদের কাছে সামরিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। তিনি সরদার গাজী খানের কাছ থেকে সামরিক তালিম নেন। ১৭৬৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি প্রথম ইঙ্গো-মহীশুর যুদ্ধে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের যুদ্ধনৈপুণ্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন।
পরবর্তী বছরগুলোতে হায়দার আলি সমগ্র দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হয়ে ওঠেন এবং টিপু সুলতান তাঁর বাবার সব সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, বাবার যোগ্য সহচর টিপুর সমস্ত ছেলেবেলাই কেটেছে যুদ্ধবিগ্রহ, সাম্রাজ্য বিস্তার ও প্রতিরক্ষার লড়াইয়ে।

শের-ই-মহীশুর
ইংরেজদের কাছে শের-ই-মহীশুরখ্যাত টিপু সুলতানের রাজ্যের প্রতীকও ছিল বাঘ। এই বাঘ ছিল তার অনুপ্রেরণার মতো। তার রাজ্যের পতাকায় কানাড়ি ভাষায় লেখা ছিল ‘বাঘই ঈশ্বর’। সিংহাসনে বসে মাঝে মধ্যেই তিনি বলতেন, ‘শেয়ালের মতো শতবর্ষ বেঁচে থাকার চেয়ে বাঘের মতো স্বাধীনভাবে একদিন বাঁচাও উত্তম।’

ছোটবেলা থেকেই তিনি বাঘের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। বাবা হায়দার আলিই তাকে বাঘের গল্প শোনাতেন। কিশোর বয়সে বাঘও পুষতে শুরু করেছিলেন টিপু। কাঠের ফ্রেমের ওপর সোনার পাত বসানো মণিমুক্তা ও রত্নখচিত তার সিংহাসনটিকে ‘ব্যাঘ্রাসন’ বললেও ভুল হবে না। কারণ আটকোণা ওই আসনটির ঠিক মাঝখানে ছিল একটি বাঘের মূর্তি। ৮ ফুট চওড়া আসনটির রেলিংয়ের মাথায় বসানো ছিল সম্পূর্ণ স্বর্ণে তৈরি ১০টি বাঘের মাথা আর ওপরে ওঠার জন্য ছিল দুধারে রুপার তৈরি সিঁড়ি। আর পুরো আসনটিই ছিল বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা। তার পোশাকও ছিল হলুদ-কালো রঙে বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা। তিনি যে তলোয়ার ব্যবহার করতেন, তার গায়েও ছিল ডোরা দাগ এবং হাতলে ছিল খোদাই করা বাঘের মূর্তি। রাজ্যের সমস্ত সৈনিকের পোশাকে থাকত বাঘের ছবি। সৈন্যদের তলোয়ার, বল্লম, বন্দুকগুলোর নল, কুদো, হ্যামারেও আঁকা থাকত বিভিন্ন আকারের বাঘের প্রতিরূপ। এমনকি রাজ্যের প্রধান প্রধান সড়কের পাশে সব বাড়ির দেয়ালে বাঘের ছবি আঁকার নির্দেশ জারি করেছিলেন টিপু সুলতান। তখনো রাজবাড়িতে বেশ কয়েকটি বাঘ পুষতেন তিনি। তার ঘরের দরজার সামনেও বাঁধা থাকত বাঘ।

১৭৯৩ সালে ইংরেজ সেনাপতি হেক্টর মুনরোর একমাত্র ছেলে সুন্দরবনের সাগর দ্বীপে বাঘ শিকার করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। এই সংবাদ পেয়ে একটি বিচিত্র খেলনা বানিয়েছিলেন টিপু সুলতান। বিখ্যাত এই খেলনাটি ‘টিপুস টাইগার’ নামে পরিচিত। ফরাসি যন্ত্রকুশলীদের দ্বারা নির্মিত এই খেলনাটিতে ক্লকওয়ার্ক সিস্টেম ব্যবহৃত হয়েছিল। খেলনায় দম দিয়ে ছেড়ে দিলে এই খেলনার একটি অর্গান পাইপ থেকে রক্তহিম করা বাঘের প্রচণ্ড গর্জন আর এক ইংরেজের প্রচণ্ড গোঙানির আওয়াজ বের হতো। এই খেলনা বানানোর পেছনে একদিকে যেমন ছিল তার ইংরেজদের প্রতি ঘৃণা, অন্যদিকে ছিল প্রচ- ব্যাঘ্রপ্রীতি।

টিপু সুলতানের শাসন
১৭৭৯ সালে ফরাসি নিয়ন্ত্রিত মাহে বন্দর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দখল করে নেয়। এই বন্দরটি রক্ষার দায়ভার ছিল ফরাসিদের মিত্র হায়দার আলি ও তার ছেলে টিপু সুলতানের কাঁধে। বন্দর পুনরুদ্ধারে ১৭৮০ সালে পিতা-পুত্র যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ইতিহাসের পাতায় যুদ্ধটি ইঙ্গো-মহীশুর দ্বিতীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থায় ব্রিটিশদের ব্যাপক ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও যুদ্ধ চলাকালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন হায়দার আলি। ১৭৮২ সালে যুদ্ধের ময়দানেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তার অকাল মৃত্যুতে ১৭৮২ সালের ২২ ডিসেম্বর মহীশুরের সিংহাসনে বসেন টিপু সুলতান। সিংহাসনে বসেই তিনি প্রতিবেশী মারাঠা সাম্রাজ্য ও মুঘলদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেন। ব্রিটিশ আগ্রাসন রুখতে তার এই সন্ধি ছিল সামরিক কৌশল ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অনন্য দৃষ্টান্ত। এই সন্ধির ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি টিপু সুলতানের সঙ্গে ১৭৮৪ সালে ম্যাঙ্গালোর চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য হয় এবং অবসান ঘটে ইঙ্গো-মহীশুর দ্বিতীয় যুদ্ধ নামক রক্তাক্ত সংঘর্ষের।

শাসক হিসেবে সুশাসনের অনবদ্য উদাহরণ স্থাপন করেন টিপু সুলতান। তার বাবার অসমাপ্ত সব কাজে মনোনিবেশ করেন। নির্মাণ করেন শহর, বন্দর, সেতু, নাগরিকদের জন্য দালান, সড়ক। আবিষ্কার করেন সামরিক আধুনিক অস্ত্রাদি। কথিত আছে, যুদ্ধে ব্যবহৃত রকেটের প্রথম উদ্ভাবক ছিলেন হায়দার আলি। আর সেই রকেট ব্যবহারের কৌশলকে আরও উন্নত করেন টিপু সুলতান।

ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের পুরোধা প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আবদুল কালাম আজাদও টিপু সুলতানকে আধুনিক রকেটের উদ্ভাবক বলেছেন। সামরিক অস্ত্র উদ্ভাবন, নির্মাণ, যুদ্ধকৌশল ও যোদ্ধা প্রশিক্ষণে টিপু সুলতান এতটাই চৌকস ছিলেন যে, তার প্রশিক্ষিত বাহিনী ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। জানা যায়, ওয়াটারলু যুদ্ধের ব্রিটিশ বীর আর্থার ওয়েলেসলি শ্রীরঙ্গপাটনার কাছে যখন টিপুর বাহিনীর আক্রমণের শিকার হন তখন তার খুব কাছেই একটি রকেট বিস্ফোরিত হয়েছিল। এই বিস্ফোরণের আতঙ্কে চিৎকার করে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। টিপু সুলতান রকেট নিয়ে গবেষণা করার জন্য শ্রীরঙ্গপাটনা, ব্যাঙ্গালোর, বিদানুর ও চিত্রদুর্গায় গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।

ধীরে ধীরে সাম্রাজ্য বিস্তারেও মনোযোগী হয়ে ওঠেন টিপু। সে সময় তার নজর পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মিত্র ত্রাভানকোর সাম্রাজ্যের দিকে। ১৭৮৯ সালের ডিসেম্বরে টিপু সুলতান ত্রাভানকোরে আক্রমণ করেন। সম্মুখযুদ্ধে তিনি ত্রাভানকোর মহারাজার প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হন। শুরু হয় আরেক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ যা ইতিহাসের পাতায় ইঙ্গো-মহীশুর তৃতীয় যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। ত্রাভানকোরের মহারাজা যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে সাহায্য দাবি করেন তখন লর্ড কর্নওয়ালিস হায়দ্রাবাদের নিজাম ও মারাঠাদের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া মিত্রবাহিনী ১৭৯০ সালে টিপু সুলতানের সাম্রাজ্য আক্রমণ করে বসে এবং কইমবাটুর জেলা দখল করে নেয়। টিপু সুলতান প্রতিআক্রমণ করলেও এলাকাটি পুনর্দখল করতে ব্যর্থ হন। ইঙ্গো-মহীশুর তৃতীয় যুদ্ধ দুই বছর কাল স্থায়ী হয়। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে ১৭৯২ সালে সেরিঙ্গাপাতাম চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে। এই চুক্তিবলে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনী ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ম্যাঙ্গালোর, মালাবারসহ অনেক এলাকা দখল করে নেয়।
যদিও মিত্রবাহিনী টিপু সুলতানের সাম্রাজ্যের অনেক অংশই দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু তাতে টিপু সুলতানের যোদ্ধাস্বভাব বা মনোবলে বিন্দুমাত্র ভাঙন ধরেনি। ব্রিটিশরা টিপু সুলতানের আতঙ্ক কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছিল না। ১৭৯৯ সালে মারাঠা ও নিজামের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফের মহীশুর আক্রমণ করে। তারা মহীশুরের রাজধানী শ্রীরঙ্গপাটনা দখল করে নেয়। ইতিহাসের পাতায় এই যুদ্ধ ইঙ্গো-মহীশুর চতুর্থ যুদ্ধ হিসেবে সুপরিচিত। যুদ্ধে টিপু সুলতান পরাজিত ও নিহত হন। টিপু সুলতানের ৩০ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ৫০ হাজার সৈন্য লড়াই করেছিল। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন জেনারেল স্যার রিচার্ড ওয়েলেসলি, আর্ল অব মর্নিংটন। মীর সাদিক নামে এক সেনাপতি বিশ্বাসঘাতকতা করে টিপুর পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ব্রিটিশবিরোধী যুদ্ধে শহীদ হওয়া প্রথম ভারতীয় রাজা ছিলেন টিপু সুলতান। ব্রিটেনের ন্যাশনাল আর্মি মিউজিয়ামে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপক্ষ কমান্ডারদের মধ্যে টিপু সুলতানকে স্থান দেওয়া হয়েছে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি লড়াই করে গেছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। তার মৃত্যুর পর চার স্ত্রীসহ সন্তানদের দূরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় নির্বাসন দিয়েছিল ইংরেজরা। টিপু সুলতানের বংশধরদের অনেকে এখনো কলকাতায় বসবাস করছে। যদিও এদের বেশিরভাগই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বিতর্ক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে বিতর্ক সৃষ্টি হয় টিপু সুলতানকে ঘিরে। ২০১৫ সালে ভারতের কর্নাটক রাজ্যে টিপুর জন্মবার্ষিকী উদযাপনকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় উত্তেজনা। ২০১৭ সালেও একই ইস্যুতে রাজ্যটিতে আবারও রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেবার রাজ্যক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস মহা ধুমধামে টিপু সুলতানের জন্মদিন উদযাপনের আয়োজন করছিল। কিন্তু এই আয়োজনে বিরোধী বিজেপি বিরোধিতা করে। বিজেপির অভিযোগ, রাজ্যে আসন্ন ভোটের কথা মাথায় রেখে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভোট টানতেই কংগ্রেস টিপু সুলতানের মতো একজন ‘খলনায়কে’র জন্মদিন পালন করা হচ্ছে। কর্নাটকের বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী অনন্ত কুমার হেগড়ে টিপু সুলতানকে একজন খুনি ও ‘কুখ্যাত ধর্ষণকারী’ বলতেও দ্বিধা করেননি। টিপু সুলতান গণহারে অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করেছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন।

টিপু সুলতানকে ঘিরে উত্তেজনা ছিল ২০১৮ সালেও। দিল্লি বিধানসভায় ৭০ জন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং দেশপ্রেমিকের ছবি উন্মোচন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গ্যালারিতে রাখা এই ছবিগুলোর মধ্যে ছিলেন আসফাকউল্লা খান, ভগৎ সিংহ, বিরসা মুন্ডা, সুভাষচন্দ্র বসু। আর ছিলেন টিপু সুলতান। মহীশুরের শাসকের এই ছবি ঘিরেই শুরু হয় বিতর্ক। বিজেপি নেতারা দাবি করে, টিপু ছিলেন কট্টর হিন্দুবিরোধী এবং গণহত্যাকারী।

এসব বিতর্কের রেশ ধরে উপমহাদেশের অনেকেই টিপু সুলতানের সময়কার প্রকৃত ইতিহাস জানতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু কোন কোন ইতিহাসবিদ মনে করেন, সেই সময়ের ইতিহাস লিখেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া ও তাদের দোসরদের মতো বিজিত শক্তি। টিপু সুলতান ছিলেন তাদের কাছে সাক্ষাৎ এক আতঙ্কের নাম। তাই নিজেদের বিজয়কে গ্রহণযোগ্য করার জন্য ঐতিহাসিক বীর টিপু সুলতানের চরিত্রে কালিমা লেপনের চেষ্টা করা হয়েছে বহুবার। আর শত্রুর গুণগান কি কেউ করে?

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, টিপু সুলতান ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তবে তার প্রজাদের বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য জোর করে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করেন এবং ফার্সি ও উর্দু ভাষা প্রণয়নে জোর দেন। ইসলামি আদলে বিভিন্ন স্থানের নতুন নামকরণ করেন।
অভিযোগ আছে, টিপু সুলতান হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর করেন। ১৭৮৮ সালে কালিকটের (বর্তমান ইসলামাবাদ) গভর্নর শের খানকে চিঠি দিয়ে হিন্দুদের মুসলমানে ধর্মান্তর করার নির্দেশ দেন এবং সেই বছরের জুলাই মাসে দুই শতাধিক ব্রাহ্মণকে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর করা হয়। এছাড়াও তিনি ২৭টি ক্যাথলিক চার্চ ধ্বংস করার নির্দেশ দেন।

তবে অনেক ইতিহাসবিদদের মতে, টিপু সুলতান মোটেই স্বৈরাচারী বা অত্যাচারী ছিলেন না। মুহিবুল হাসান, প্রফেসর শেখ আলির মতো ইতিহাসবিদরা মনে করেন, টিপু সুলতান হিন্দুদের এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ১৭৯১ সালে মারাঠার রঘুনাথ রাও পটবর্ধনের ঘোড়সওয়ারেরা কন্নড়ের মন্দিরগুলো ধ্বংস এবং অনেক পুরোহিতকে হত্যা ও আহত করে। তখন টিপু সুলতান মন্দিরগুলো পুনর্নির্মাণে যাবতীয় সহায়তা দেন এবং পুরোহিতদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। এমনকি ফরাসিদের সঙ্গে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে বেশকিছু গির্জাও নির্মাণ করেন তিনি।

বেশ কয়েকজন ইতিহাসবিদ দাবি করেন, টিপু সুলতান তার প্রশাসনেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হিন্দু কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হিসাবরক্ষক কৃষ্ণা রাও, ডাক এবং নিরাপত্তামন্ত্রী স্বামী আইয়েঙ্গার। মুঘল সাম্রাজ্যে টিপুর প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন সুজন রায় এবং মূলচান্দ। তার পেশকার ছিলেন সুবা রাও।

অনেকেই দাবি করেন, মালয়লি লোকসাহিত্যের অন্যতম নায়িকা চরিত্র উন্নিয়ারচাকে বন্দি করে নিজের প্রাসাদে নিয়ে গিয়েছিলেন টিপু সুলতান। উন্নিয়ারচা ছিলেন এক সাহসী যোদ্ধা এবং রূপবতী নারী। তার জন্ম হয়েছিল বিখ্যাত কুরূপ বংশে। দক্ষ ছিলেন মার্শাল আর্টে। উরুমি নামে বিশেষ এক ধরনের তলোয়ারও ভালো চালাতেন তিনি। মালয়লিদের রক্ষা করার জন্য অনুগামীদের নিয়ে লড়াই করতেন এই যোদ্ধা নারী। মালবার উপকূলে অভিযান চালিয়েছিলেন টিপু সুলতান। তেল্লিচেরি প্রদেশে টিপুর বাহিনীর মুখোমুখি হয় উন্নিয়ারচা। তবে নিজের পরিবারকে বাঁচাতে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন।
শোনা যায়, শেষ পর্যন্ত এই সুন্দরীর স্থান হয়েছিল টিপু সুলতানের হারেমে। কথিত আছে শ্রীরঙ্গপত্তনমে টিপুর জেনানা মহল নামে একটি হারেমে ছয় শতাধিক নারী ছিলেন। সেই হারেমেই রাখা হয় উন্নিয়ারচাকে। এও জানা যায়, উন্নিয়ারচাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন টিপু সুলতান।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে লাইক বাটনে ক্লিক করুন। হ্যালোটুডে’র ইতিহাস বিভাগে নিয়মিত লিখতে পারবেন আপনিও। আমাদের সমৃদ্ধ করে তুলতে পারেন, আপনার সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত লেখা দিয়ে। হ্যালোটুডে আপনার মনের কথা বলে।

 

তথ্য: ইন্টারনেট

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

June 2024
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930