ভ্রমন

ছিমছাম গুছানো সুন্দর শহর- ভুটানের থিম্পু

থিম্পু শহর

পর্ব-০১

থিম্পু (Thimphu) ভুটানের রাজধানী এবং দেশের সব থেকে বড় শহর। এটি ভুটানের পশ্চিম অংশে, হিমালয় পর্বতমালার একটি উঁচু উপত্যকায় অবস্থিত। অতীতে এটি দেশের শীতকালীন রাজধানী ছিল। ১৯৬২ সাল থেকে একে দেশের রাজধানী এবং স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। পাহাড় ঘেরা থিম্পু শহর খুবই সুন্দর। থিম্পু ঘুরে এসে অভিজ্ঞতার বর্ণনা জানাচ্ছেন অমিত গোস্বামী।

রবীন্দ্রনাথ ‘তাসের দেশ’ লিখেছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায়। কিন্তু তা যেন প্রকাশিত হয়েছে আজকের ভুটানে। মনে আছে সেই গানটা?
“চলো নিয়ম-মতে/ দূরে তাকিয়ো নাকো/ ঘাড় বাঁকিয়ো নাকো /চলো সমান পথে।’

থিম্পু শহর ঘুরে এসেছেন লেখক

ভুটানের আইন
এদেশে বেশ কিছু আইন চাপানো হয়েছে ১৯৮৫ সালের নাগরিকত্ব আইন আনার সাথে সাথে। ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান পিপল’ তত্ত্ব ভুটানের জাতিসত্তার পরিচয়কে আইনী স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়াস। কি কি নিয়ম চালু হয়েছিল এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে?

১) ভুটানিদের জাতীয় পোশাক মেয়েদের ‘কিরো’ ও ছেলেদের ‘ঘো’। এই পোশাক সকল কর্মক্ষেত্র অনুষ্ঠান সভা সমাবেশ – প্রায় সকল স্থানে পরা বাধ্যতামূলক।
২) ভুটান যেহেতু বৌদ্ধধর্মী তাই এখানে কোনরকম প্রণিহত্যা নিষিদ্ধ। মাছধরা বা হত্যা, পাখিধরা বা হত্যা নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে বিনাবিচারে ৯ মাস জেল। তাহলে আমিষ খাদ্য কিভাবে খাবে? গরু, শুয়োর, খাসি, মুরগী, মাছ – সব ভারতের জয়গাঁ থেকে কাটিয়ে ড্রেস করে ভুটানে ফ্রোজেন করে ঢোকে। টাটকা কনসেপ্ট নেই এখানে।
৩) এখানে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে ৫০০ টাকা জরিমানা। অনাদায়ে ৩ দিন সশ্রম কারাদন্ড। তাহলে কি ভুটানের মানুষ কি সিগারেট খায় না। প্রকাশ্যে কেউ খায় না। তবে চোরাগোপ্তা পাওয়া যায়। দাম আগুন। তরুন নারী-পুরুষ সবার পছন্দ।
৪) গাড়ি চালানোর সময় হর্ণ দেওয়া নিষিদ্ধ। জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে গতি নামাতে হবে। পথচারী আগে যাবে।
৫) পার্কিং ছাড়া গাড়ি পার্ক করা যাবে না। রাস্তায় থু থু ফেলা যাবে না। হকারি নিষিদ্ধ। ফুটপাথে কোন ভিখারি নেই।
৬) ১৯৯৯ সালে এদেশে টিভি এসেছে। কিন্তু দেশীয় চ্যানেলে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুষ্ঠান প্রচারের অনুমতি নেই। ভারতীয় ও অন্যান্য বিদেশি চ্যানেল প্রচারিত হয়। তবে উচ্চমূল্যে। এদের চ্যানেলে বিজ্ঞাপণ নিয়ন্ত্রিত।
৭) সংবাদপত্রে যা খুশি লেখা যায় না। সরকারের সমালোচনা করা যাবে। তবে তার সাথে সরকারের বিবৃতি ও ব্যখ্যা দিতে হবে।
৮) সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপণ না দিয়ে কোন প্রকার নিয়োগ নিষিদ্ধ।
৯) কাউকে ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। জরুরী ক্ষেত্র ছাড়া (বিদ্যুৎ, জল সরবরাহ, চিকিৎসা ইত্যাদি) প্রত্যেকের কাজের নির্দিষ্ট সময়সারনী থাকবে এবং তা সরকারকে জানাতে হবে।
১০) মদ্যপান এদের সংস্কৃতির অঙ্গ। কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় খেতে হবে। মাতলামি চলবে না। আরো কিছু দিক আছে এদের নিয়মকানুনের।

ভুটানে বুদ্ধ ডর্ডেনমা
থিম্পু শহরের প্রায় সব প্রান্ত থেকেই বুদ্ধ ডর্ডেনমা মূর্তিটি চোখে পরে। এটি মহান সক্যমুনি বুদ্ধের সবচেয়ে বড় উপবিষ্ট মূর্তি (সক্যমুনি বুদ্ধের অন্যতম নাম। শাক্য জনগোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণের কারণে তার এ নামকরণ)। মূর্তিটি ১৬৯ ফুট উঁচু (প্রায় ১৭ তালা ভবনের সমান)।

চতুর্থ রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুকের ৬০তম জন্ম বার্ষিকী উদযাপনে উপলক্ষ্যে ভুটানের রাজধানী থিম্পুর কুয়েসেলফোদরং পাহাড়ে এই বিশালাকায় মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বুদ্ধ মূর্তি যে ভবনের উপর প্রতিষ্ঠিত তার মধ্যে ১ লক্ষ বুদ্ধ ডর্ডেনমার অনুরূপ ব্রোঞ্জের ছোট মূর্তি রাখা আছে। ছোট ব্রোঞ্জের মূর্তিগুলোও সোনায় রাঙানো।


বুদ্ধ ডর্ডেনমা মুখী ও চারপাশে খোলা আঙিনায় নারী ভাস্কর্যগুলোও বেশ। সম্ভবত, এ মূর্তিগুলো সুজাতাকে প্রতিনিধিত্ব করে। পাশেই প্রধান ভান্তের বাসভবন। এর আনুমানিক খরচ প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। করেছে একটি চীনা সংস্থা।

মোটিথাং টাকিন কেন্দ্র
লামা দ্রুকপা কুণলে। ভুটানের মানুষ বিশ্বাস করেন তিনিই সবচেয়ে ঐশ্বরিক ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি। ভুটানিরা তাঁকে দ্য ডিভাইন ম্যাডম্যান বলে ডাকেন। এই মিথ থেকেই আজ আপনাদের বলব টাকিনের গল্প। সে পঞ্চদশ শতাব্দীর ঘটনা। একদিন ভক্তদের ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেখাবার জন্য তিনি একটা গরু ও একটা ছাগল চাইলেন। ভক্তরাও সঙ্গে সঙ্গে গরু ও ছাগল নিয়ে হাজির। সবাইকে অবাক করে ওই দুই চতুষ্পদকে আগুনে ঝলসে দিতে বললেন তিনি। কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই খুব কম সময়ে দ্রুকপা কুণলে খেয়ে ফেললেন তাদের। শুধু পড়ে রইল হাড়গোড়। ভক্তরাতো হকচকিয়ে গেলেন। কিন্তু অবাক হওয়ার এখানেই শেষ নয়! হঠাৎ তিনি ছাগলের মাথা আর গরুর হাড় জুড়ে দিলেন। হাততালিতে ফেটে পড়ল পাহাড়ের আকাশ বাতাস। করতালির শব্দে সেই কঙ্কাল পরিণত হল এক পশুতে। লাফাতে লাফাতে অদ্ভুতদর্শন সেই প্রাণী চলে গেল চারণভূমিতে। ভুটানের মানুষের বিশ্বাস এই প্রাণীই হল টাকিন। টাকিনই হল ভুটানের জাতীয় পশু।
টাকিন'(Budorcas taxicolor), একটি ছাগল-জাতীয় প্রাণী যাদের মূলত দেখা মেলে পূর্ব হিমালয় অঞ্চলে।

সিমতোখা জং – ১৬২৭ সালে তৈরি এই জং থিম্পু ভ্যালির গেটওয়ে। থিম্পুর সবথেকে পুরনো এই জঙয়ে আছে রিগনে স্কুল ফর জঙঘা এ্যাণ্ড মোনাষ্টিক ষ্টাডিস। ফ্রেশকো এবং স্লেট কার্ভিংস সিমতোখার বিশেষ আকর্ষণ।

থিম্পু জং-(ফোট্রেস অব দ্য গ্লোরিয়াস রিলিজিয়ন)
থিম্পু জং হলো ভূটানের রাজধানী থিম্পু শহরের প্রাণকেন্দ্র। ১৬৬১ সালে এটি তৈরি। এখানে আছে সরকারি ডিপার্টমেণ্ট, দ্যা ন্যাশনাল এসেম্বলি, রাজার থ্রোন রুম এবং সেন্ট্রাণ মনাষ্টিক বডির গ্রীস্মকালীন হেডকোয়ার্টাস।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি – ১৯৬৭তে প্রতিষ্ঠিত এই জাতীয় গ্রন্থাগার বড়ো নয়, তবে ভুটানের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক ঐতিহ্য সম্পর্কিত তথ্য ও সাহিত্যের মূল্যবান ভাণ্ডার রয়েছে এখানে। ১৭৭৩ সালের ভারত-ভুটানের ম্যাপ, লেখার সরঞ্জাম, জঙ্খা ভাষায় লেখা বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত পুরোন বইপত্র আছে এখানে।

মেমোরিয়াল চরথেন – এটি মূলত স্মৃতিস্তম্ভ। ভূটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দরজি ওয়াঙচুকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭৪ সালে এই স্তুপ তৈরি হয়েছিলো। এর ভেতরের বিভিন্ন পেইণ্টিং এবং স্ট্যাচু বৌদ্ধ ফিলোসফির প্রতিবিম্ব।

হ্যান্ডিক্রাফট বাজার-শহরের কেন্দ্রস্থলে সারিসারি দোকান। কিন্তু বেশিরভাগ জিনিষ থাইল্যান্ড সিকিম বা ভারত থেকে আগত। সবাই নিশ্চিন্তে বসে আছে। বিক্রির ইচ্ছে নেই। অস্বাভাবিক দাম হাঁকছে। নিজেদের তৈরি দেওয়াল হ্যাংগিং বা মুখ প্রতিকৃতির দাম যা হাঁকছে তাতে পুরুলিয়ার ছৌমুখোস শিল্পীদের জন্যে সত্যি দুঃখ হল। থিম্পুতে এসে এই জায়গাটা আমায় সবচেয়ে হতাশ করেছে।

ছবি: লেখক

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

June 2024
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930