গল্প

বাবার অভিমান

সাময়িকী: শুক্র ও শনিবার

-তানিয়া হোসেন

মাঝে মাঝে বাবার নাম্বারে ফোন করি। নাম্বারটা এখন বন্ধ, তবুও করি। ভালো লাগে আমার এই বন্ধ নাম্বারে কল দিয়ে ফোনটা কানে লাগিয়ে রাখতে।

পাঁচবছর পর একদিন খুব সকালে বাড়ি থেকে ফোন পাই। ওপাশ থেকে কেউ একজন “এক্ষুনি বাসায় চলে আসো” বলে কলটা কেটে দেয়! দীর্ঘ পাঁচবছর পর আসা এই ডাকটা আমার কাছে মহা আনন্দের হতে পারতো। কিন্তু ভয়ংকর এক আতঙ্ক নিয়ে আমি ছুটে যাই।

এই পাঁচবছর কতদিন কতরাত শুধু ফোনটার দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে একটা মিরাকল ডাক শোনার অপেক্ষায় থেকেছি! অপেক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে গেলেও স্বপ্নে দেখতাম, একটা দরাজ গলা ফোনে আমাকে ভাত খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করছে, রাতে আমাকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে বলছে, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে সেটাও বলছে ফোন করে। নতুন লাগানো গাছটার ঢাল কে যেন ভেঙ্গে দিয়েছে সেই নালিশও দিচ্ছে!!
ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতাম, চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছি আমি! গভীর রাতে প্রিয় সেই নাম্বারটাতে ছুঁয়ে দিতাম। ফোন করা নিষেধ ছিল।
কি ভয়ংকর এক অভিমান আমাকেও আটকে রাখতো!!

আজ সকাল সকাল সেই বাড়ি থেকে ডাক এসেছে। দীর্ঘ পাঁচ পাঁচটা বছর অপেক্ষা করার পর ডাক এসেছে! আমি অবশ হয়ে বিছানার উপর কতক্ষণ বসেছিলাম মনে নাই। আমার দু’বছর বয়সী মেয়েটা হটাত কেঁদে উঠে। আমি অবশ চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি শুধু। মেয়েকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর কথা একদম ভুলে যাই! আমি তখন মেয়ের দিকে আমি তাকিয়ে ভাবছি, এখন কি আমার এমন করে কাঁদা উচিত?

মেয়ের কাঁদার শব্দে ওর বাবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে আমার তাকিয়ে থাকা দেখে অবাক হয়! মেয়েকে শান্ত করাতে করাতে সে এসে আমার পিঠে হাত রাখে, প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি কথা বলার মত শক্তি বা ভাষা খুঁজে পাইনা।

তবুও ছোট্ট করে বলি, “চল এক্ষুনি বাবাকে দেখে আসি”।
বাবাকে দেখতে গিয়ে দেখি অনেক অনেক মানুষের ভিড় আমাদের ছোট্ট বসার ঘরটাতে। আমি রুমে ঢুকার পর সবার দৃষ্টি একসাথে আমার উপর এসে পরলো। যেন সবাই এতক্ষণ আমার অপেক্ষাতেই ছিল!

আমি দেখতে পাই, মেঝেতে কার্পেটের উপর বিছানো খাটিয়াতে বাবা শুয়ে আছে। কি শান্ত একটা মুখ! অথচ এই মুখটার সামনে দাঁড়াবার সাহস হয়নি এই দীর্ঘ পাঁচ পাঁচটা বছর!!

কতদিন পর… এত কাছে আসতে পেরেছি! যেন কত যু…গ পর! এত কাছে আসার আনন্দে আমার কান্না আসছে কিন্তু আমি কাঁদতে পারছি না।
আমি বাবাকে ছুঁয়ে দেখার লোভ সামলাতে পারিনা।
মুখটা ছুঁয়ে দেখি, ঠিকমত ঘুমাও না? মুখটা এত শুকিয়ে গেছে কেন!
হাত ছুঁয়ে দেখি, কত্ত দিন হাতে লোশন দাওনা তুমি!
বাবার পা ছুঁয়ে দেখি, তোমার পায়ের নখ কে কেঁটে দিত বাবা!
মাথায় হাত দিয়ে দেখি, চুল অনেক পাতলা গেছে কেন!
ঠিক কতক্ষণ ধরে একটা নিষ্প্রাণ শরীর হাতড়ে একটু উষ্ণতার খোঁজ করেছি জানি না আমি। কেউ একজন আমাকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করায়। কেউ কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেও দেখি। কিন্তু আমি ঠিক কেন এবং কিভাবে কাঁদবো বুঝতে পারি না। আমি কাউকে চিনতে পারছি না। আমি ঘোলা চোখে শুধু দেখি অনেক গুলো ঝাপ্সা ঝাপ্সা মুখ আমাকে আদর করছে, আমার জন্য কাঁদছে। আমাকে যে এত মানুষ ভালবাসে আজকেই জানলাম!

অসংখ্য গুনগুন নিচু গলার ফিসফাস শব্দ আমার মাথায় জটলা পাকাচ্ছে। আমি টলমলে পায়ে এ ঘর থেকে ও ঘর হাঁটছি।

আমার ঘরটা আগের মতোই আছে। অনেক অনেক বছর আগে লাগানো লাল নীল প্রজাপতি আঁকা জানালার পর্দাটা এখনো ঝুলছে! দেয়ালে লাগানো প্রিয় লেখকের পোস্টার, কাগজের ফুল পাতার স্টিকার, ডানাভাঙা প্রজাপতি সবাই আগের জায়গামতই বসে আছে! দেয়ালের রঙটাও মনেহচ্ছে কিছুদিন আগে করা হয়েছে! শেষবার বিছানাটি কি এদিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলাম! আমি আবার কিছুদিন পর পর বিছানা এদিক ওদিক করে রাখতাম তাই ভুলে গেছি। কিছুই মনে পড়ছেনা আমার। মাঝখানে যেন অনেক হাজার বছর কেটে গেছে!! বুকশেলফটাও দেখি সেই আগের জায়গাতে আছে! গল্পের বইগুলোর উপর যে ধুলো পরার কথা!

একটুও ধুলোবালি নাই কোথাও! মনেহচ্ছে প্রতিদিন একবার করে ঝাঁট দেয়া হয়। আমি নাই তাতে কি! একটু আগেই যেন আমি এই রুম থেকে বেরিয়ে গেছি এমন ভাবে রুমটা গুছানো আছে!! আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখছি আর আমার নাকে সেই ছোট্ট বেলার গন্ধটা এসে লাগল!

আমার কানে ছোট্ট বেলার সেই দরাজ গলার ডাক “অফুত…অ মা”!!
মার গলার বকা, ধমক! রান্নাঘরের বিকট শব্দে কিছু পরে যাবার ঝনঝন শব্দ, নষ্টকল থেকে অবিরাম টিপ টিপ করে পরা পানির শব্দ, বারান্দা থেকে আসা পাখীর ডাক…! একসাথে ঢুকছে… আর বেরুচ্ছে ……উফ! কি ব্যাথা! আমি কান চেপে এক দৌড়ে বের হয়ে যাই।

বাবার রুমে কয়েকজন মিলে কথা বলছিলো। আমাকে দেখতে পেয়ে কথা থামিয়ে সরে দাঁড়ালো। আমি বাবার পড়ার টেবিলটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠিক যেমনটা পিকনিকের আগের রাতে বা অন্যায় আবদার করার জন্য গিয়ে দাঁড়াতাম, টেবিলের সাথে পেটটা চেপে ধরে।

চশমাটা একপাশে আছে, খোলা বইটা উল্টানো। মনেহয় কালরাতে বেশী খারাপ লাগছিলো দেখে অর্ধেকটা পড়ে রেখে দিয়েছে। লোকমান চাচা বলল, রাতে নাকি ভাল মত কিছু খায়নি বাবা। তাড়াতাড়ি শুয়েপরেছে। সকালে উঠতে দেরী হচ্ছে দেখে ঘুম থেকে ডাকতে গিয়ে দেখতে পায় নিথর বাবাকে।
ভীষণ ক্লান্ত লাগছে আমার। কেউ একজন মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদার জন্য বলছে আমাকে। আমার এখন কাঁদার মতো শক্তি নাই। আমি বাবার সাদা ধবধবে বিছানায় শুয়ে পরলাম।

এইতো সেদিনও ঘুম না আসলে মাঝরাতে বাবার বিছানায় এসে শুয়ে পরতাম। মাঝরাতে বালিশ নিয়ে পা টিপে টিপে বাবার রুমে ঢুকে বাবার পাশে শুয়ে পরতাম।
বাবা গভীর ঘুম থেকে চোখ না খুলেই বলত, “আরেকটু এদিকে সরে আয়, পরে যাবিতো”।

আহ!! কি শান্তির ঘুমটাই না হতো বাবার এই বিছানায়! কি যে আছে জানি না এই জাদুর বিছানাতে!
বাবাকে একদিন বলেছিলাম, “বাবা তোমার এই খাটকে রিসার্চে পাঠানো উচিত। এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটা বিরাট সাফল্য যোগ করবে। ইনসোনোমিয়া রোগীদের জন্য একটা যুগান্তকারী ঔষধ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারবে তোমার এই বিছানা”!

আমার কথা শুনে বাবা খাট কাঁপিয়ে হো হো করে হাসতো। বাবার হো হো হাসির শব্দে পুরো খাট, পুরো রুম দুলে দুলে উঠতো আর আমি সেই দুলুনিতে রাজ্যের ঘুম চোখে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতাম।

Add Comment

Click here to post a comment

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

April 2024
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930