গল্প

শেকড়

ছবি: প্রতীকী

(১) বাবার সৎকার শেষ। আজ কূলখানিও শেষ হলো। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে বাবার কাজ সম্পন্ন করেছি। মিলাদ, কোরান খতম, দান ক্ষয়রাত। এখানে আমাদের রক্তের সম্পর্কের কোন আত্মীয় নেই। বাবার পরোপকারী ও মিশুকে স্বভাবের কল্যাণে প্রতিবেশীরাই আত্মীয়। কেউ কেউ পরমাত্মীয়। এই জেলা শহরে এখনও সতেজ বাতাস সহজিয়া জীবন। কূলখানিতে সবাই এসেছিলেন। অনেকে তদারকি করেছেন, খাওয়া দাওয়া করেছেন, দোয়ায় অংশ নিয়েছেন এবং মাথায় হাত বুলিয়ে নানা উপদেশ ও সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেছেন।

আত্মীয় নেই কেন তা কখনই আমার মাথায় আসেনি, কিন্তু আজ আসছে। বাবা বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন ষ্টেশন মাষ্টার ছিলেন। চাকরি সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অবশেষে অবসরে যাবার সময় হলে, জয়দেবপুর ও মির্জাপুর স্টেশনের মাঝামাঝিতে একটুকরো জায়গা কিনে একটা বাড়ি করেছিলেন। ইটের দেয়াল উপরে নতুন রূপালি টিন। ছোট্ট ঝকঝকে বাড়িটি আমার খুব পছন্দের। বাড়ি করার সময় বাবা প্রতিটি ধাপে আমার মতামত নিতেন। অবশ্য বলা যায় জীবনের প্রতিটি কাজে অকাজে বাবা, পুত্রের পছন্দ অপছনের মূল্যায়ন করতেন। আমরা বাড়ির ভেতরে বাহিরে চারপাশে বেশ কিছু গাছ লাগিয়েছিলাম, ফলের এবং ফুলের। বাবা সকাল বিকেল সেগুলোর যত্ন নিতেন। গোড়ায় জল দেয়া, সার দেয়া, খুঁচিয়ে দেয়া, আগাছা নিড়ানো, ডাল কাটা নানারকম কাজ। বিনিময়ে ওরা এখন আমাদেরকে উজাড় করে দিচ্ছে।

বাড়ির সামনে একটা শিউলি গাছ আছে মরশুমে যেটা প্রচুর ফুল ফোটায়। বাড়ির সামনের চিলতে জায়গাটুকু শিউলি উঠোন হয়ে যায়।
চারপাশের ফুল চোরেরা ভোর বেলা এসে কুড়িয়ে নিয়ে যায়। আর বকুল আসে যখন তখন উঠোনে আর ফুল থাকেনা ও খুব বিব্রত হয়ে পড়ে। সে তার মরাল গ্রীবা তুলে উঁচু ডালগুলোর দিকে তাকায়, সেগুলো ওর নাগালের বাইরে। স্যান্ডো গেঞ্জি আর ঘাড়ে তোয়ালে সহই আমি দ্রুত বের হয়ে আসি, কোন কথা না বলে ডাল ঝাঁকিয়ে দিলে জাফরান বোটায় শুভ্র তারাগুলি টুপটুপ করে বকুলের সারা শরীর আর চারপাশে ঝরতে থাকে। আর সেই খসে পরা তারাগুলি, এক চঞ্চল হরিণী ঝলমলে মুখে, কুঁড়াতে থাকে একটি একটি করে ।
-এই যে বকুলফুল! আর লাগবে নাকি?
-নাহ, আর লাগবে না।

উড়নায় কোঁচরভরা ফুল নিয়ে বকুল চলে গেলে আমি স্নানে যাই। মনোগহীনে গানের কলি গুঞ্জরন তোলে
“বকুলফুল বকুলফুল সোনা দিয়া হাত কেনে বান্ধাইলি, শালুকফুলের লাজ নাই”…
আমার শত কাজের মাঝে এই মেয়েটি আমার ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়। এক অবোধ্য মাদকতায় আচ্ছন্ন করে রাখে। অবচেতনে আমি জপ করি- “বকুল” “বকুল”।

কিন্তু ভেবে পাইনা আজকাল কি কারো নাম বকুল হয়! আজকাল মেয়েদের কত আধুনিক নাম! পারমিতা, নিহা, লামিয়া, শাকিরা, আনায়াহ…
এখানে একটি কাকতালীয় ব্যাপার আছে-আমার মায়ের নাম ছিল ‘বকুল’।
এজন্য বাবাও বকুলকে খুব স্নেহের চোখে দেখে। কেবল কি এ জন্যেই! বকুল স্নেহ পাওয়ার মতই একটি স্নিগ্ধ, হাসিখুশি মেয়ে। আজকালকার ফেসবুকে ডুবে থাকা আত্মকেন্দ্রিক, ফ্যাসানবল, দেমাগি মেয়ে নয়।

বকুলের বাবাও একজন ষ্টেশন মাষ্টার, বর্তমানে তিনি আছেন মির্জাপুর স্টেশনে।  বাবার থেকে জুনিয়র, এখনও কর্মরত। একসময় চিটাগাং রেলওয়ে কলোনিতে আমরা একসাথে ছিলাম। তখন আমি পলোগ্রাউন্ড স্কুলে উপরের ক্লাসে পড়তাম। আর এই বকুল তখন সবে স্কুলের প্লে, নার্সারি, কেজির ভুবনে পেরিয়ে কোন এক শ্রেণিতে পড়ত।
মাঝে মাঝে চাচী কিছু তরকারী বা স্পেশাল কিছু রান্না করলে ওকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলে বাবা বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে উঠে। কাছে বসিয়ে ওর সাথে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসে। আমার মায়ের গল্প করে। কত যে গল্প…
মাঝে মাঝে আমি ইচ্ছে করে ক্ষেপাই, কাবাব মে হাড্ডি হয়ে যাই…
-বাবা, বকুল তোমার গল্প শুনছেনা, ওর কি এসব শুনতে মজা লাগে! অমনি বাবা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে-
-ও আচ্ছা! আচ্ছা! মারে! তোর বুঝি অন্য কাজ আছে! আমি তোকে আটকায় রাখছি! দ্যাখ দেখি, বুড়ো হওয়ার এই জ্বালা। যা মা যা তুই…
-চাচা, এখন আমার মোটেও অন্য কাজ নেই, আর চাচীর গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে, চাচীর কথা আমার অল্প অল্প মনেও আছে, খামোখাই রেহানদা মিছে কথা বলে। চাচা আপনি বলুনতো…আমি কপট দৃষ্টি হেনে হাসতে হাসতে চলে আসি।

আমি একটি কোচিং সেন্টারে ফিজিক্স ও ম্যাথ পড়াই আর বিসিএস এর জন্য পড়াশোনা করি। একবার বিসিএস দিয়েছিলাম লিখিত পরীক্ষা পর্যন্ত হয়েছিল কিন্তু ভাইভায় এসে আটকে গিয়েছি। এবারে দম ধরে আছি দেখি আমাকে কি করে আটকায়! এই বিসিএস নিয়ে আমার এক ধরনের সংগ্রাম ও রোমান্টিক স্বপ্ন আছে। অবশ্য আমার সংগ্রাম ও স্বপ্ন থাকলেও কোন দুঃখ নেই।
ঠিক এই লগ্নে অলক্ষ্যে কেউ একজন বুঝি হাসলেন!

আমাদের কোচিং সেন্টার থেকে প্রতিবছর প্রচুর ছেলেমেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পায়। বকুলও এই সেন্টারেই কোচিং করত। চাচা চাচীর কথামতো মাঝে মাঝেই আমি ওকে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের কঠিন অধ্যায়গুলি বুঝিয়ে দিতাম। সে মন দিয়ে সেগুলো বুঝে নিত, আবার সময়ে অমনোযোগীও হত। তার মনোযোগ কিংবা অমনোযোগ দুটোই আমাকে মোহিত করত। সে ঢাকা ভার্সিটিতে বোটানিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। বকুল সহ চাচা চাচীও ভীষণ খুশি।

(২)
কুলখানির শেষ আগরবাতিটিও গন্ধ বিলিয়ে ছাই হয়ে গেছে।
বারান্দা থেকে উঠানে নামার কয়েকটা সিঁড়ি আছে। মাঝরাত পর্যন্ত সেই সিঁড়িতে বসে রইলাম। মাথার উপর তারকাখচিত আকাশ। আদর বুলানো বাতাস। মাঝে মাঝেই প্রবল ইচ্ছে হতে লাগলো, একছুটে যাই কবরের কাছে, গিয়ে বলি-
-বাবা, তুমি যা বলে গেলে তা সত্য নয়। এ তোমার প্রলাপ বাবা, এ কথা তুমি সজ্ঞানে বলনি। এ আমি কি করে বিশ্বাস করি! কই মা তো কোনদিন তেমন কিছু বলেনি। আমিওতো কোনদিন কিছু আঁচ করিনি! আমি এখন কি করব বাবা! প্লিজ তুমি বলে যাও। এভাবে এক ব্লাকহোলে আমাকে ছুঁড়ে দিয়ে তুমি চলে যেতে পারোনা বাবা।
বসে বসে শৈশব, কৈশোরের কথা মনে করার চেষ্টা করি। ছোটবেলায় এক মামা মাঝে মাঝে আসতেন তিনি আমাকে অসম্ভব আদর করতেন। যতবার আসতেন আমার জন্য আমার প্রিয় জিনিসগুলি হাত ভর্তি করে নিয়ে আসতেন। আর কোত্থেকে ডেকে আনতেন আজব এক একজন মানুষকে। তারা কেউ সাপের খেলা, বান্দরনাচ, যাদু ইত্যাদি দেখাত। একবার বিস্ময়কর একজনকে এনেছিলেন যিনি ছিলেন একইসাথে পাখি, ঝড়, মেঘ, বেড়াল কিংবা ঘোড়া। সে বিস্ময় আমার আজও কাটেনি। তিনি ছিলেন একজন হরবোলা। পরে এক এক্সিডেন্টে মামা মারা যান। কই মামার আচরণে তো অন্যরকম কিছু ছিলোনা। সারা ছোটকাল জুড়ে কোন অসঙ্গতি আমার মনে পড়লো না।
রাত ভোর হবার আগে ঘরে এলাম। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে আমি অবাক হতেও ভুলে গেলাম!
আমার জীবনে এসব কি ঘটছে! মনে মনে বললাম
-বাবা, জানো কি ঘটেছে! আমার বিসিএস হয়ে গেছে। তোমার এত যে আশা আর প্রার্থনা ছিল তা পুরণ হয়েছে। কদিন আগে হলেই তুমি জেনে যেতে পারতে বাবা। একই সাথে অমাবস্যা পুর্ণিমা, হর্ষ বিষাদ যেন হাত ধারাধরি করে আসছে আর আমাকে বেশামাল করে তুলছে।
মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে খুব ইচ্ছে করল খবরটা বকুলকে দিতে। নাহ থাক। ওকে আর জড়িয়ে কি হবে!
আমি বরং ব্যাগ গুছাতে লাগলাম। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। দুমড়ে মুচড়ে যেতে যেতে আমার যত সনদপত্র, জামা কাপড়, বাবামার একটা বাঁধানো ছবি ব্যাগে ভরে নিলাম। ধীরে ধীরে সব ঘরে তালা লাগালাম। লঘুপায়ে বাড়িটা চক্কর দিলাম কতবার। কেউ উদ্বিগ্ন হলো না
‘বাবা কি হয়েছে তোর’!

এরপর সকালের অপেক্ষায় ভোর হওয়া দেখলাম। অন্ধকারের গর্ভ থেকে ভোরের জন্ম এক অপার্থিব আয়োজন, যা কেবল অনুভূতির গভীরে উপলব্ধি করা যায়। আজানের আওয়াজ ভোরকে বিদীর্ণ করার আরো পরে বের হয়ে এলাম। শিউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে কলিজা নড়ে গেল। চোখ ভিজে উঠলো। আশ্বিনের বাতাসে গাছের কুঁড়িরা খলবল করছে। শিউলি উঠোন মাড়িয়ে বাইরের দরজায় তালা লাগিয়ে চাবিটা একটা ছোট ছেলের হাতে দিয়ে বকুলের মা চাচীকে দিতে বলে ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। রাস্তার কুকুরটিও বরাবরের মতই সঙ্গী হলো। ও হ্যাঁ তার আগে আমি সিমকার্ডটি সজোরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম একদিকে।

ছবি: প্রতীকী

(৩)
বাবার বয়স হয়ে গিয়েছিল। বহুদিন থেকে বার্ধক্যজনীত কারনে ভুগছিলো। কিন্তু হুঁশ জ্ঞান ছিল টনটনে। গাছপালার পরিচর্যা আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে কখনও ভুল করত না।
মৃত্যুর দিন গায়ে আকাশ পাতাল জ্বর ছিল, সেদিন আমি ক্লাস নিতে যাইনি। সারাক্ষণ বাবার কাছে ছিলাম।
বাবা বলেছিল তুই না গিয়ে ভালো করেছিস, তোর সাথে আমার কথা আছে।
-বাবার কাপড় চেঞ্জ করে, গা স্পঞ্জ করে দিয়ে গরম একটু স্যুপ দিয়েছিলাম। এই স্যুপটাও চাচী পাঠিয়েছিলেন। সেটা বাবা ছোট ছোট চুমুকে শেষ করেছে। মুখ মুছিয়ে দিলে বলেছে আর কিছু খাবনা। এখন তুমি আমার পাশে বসো। এইটুকু খেতে আর এইটুকু বলতে হাফিয়ে উঠলো।
-বাবা রেহান শোন, আমি এখন তোকে অল্প কটি কথা বলব যা জানা তোর দরকার। কিংবা আমার বলা দরকার। বলে বাবা আবার জোরে জোরে হাঁপাতে

লাগলো।
-ব্যস হয়েছে, পরে কথা বলা যাবে, এখন তুমি একটু চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নাও তো।
-না। সময় নাই। তুমি আমার সামনে বস। হঠাত বাবা তুমি করে বলতে শুরু করল। বাবার কন্ঠে কিযেন একটা শক্ত দৃঢ় ব্যাপার ছিল আমি বিনা বাক্যব্যয়ে বসে পড়লাম।
-শোন, আমার হাতে সময় নেই। জানি তুমি কষ্ট পাবা, কিন্তু না বলেও আমার উপায় নেই। বাবা! বাবারে!
থেমে গিয়ে বাবা একটু ইতস্তত করতে থাকে। এরপর দম নিয়ে বলতে শুরু করে-
-বাবা রেহান, আমি তোমার পিতা নই, তুমি আমার পুত্র নও। তুমি কষ্ট পেওনা…  প্রবল ভাবে হাঁপাতে থাকে… অতি কষ্টে আবার বলে, তবে আমি তোমাকে

আমার পুত্র জ্ঞানে মানুষ করেছি…এর চেয়ে বড় কোন সত্য নাই। তাঁর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হতে থাকে।
-বাবা, তুমি চুপ কর! একটু থাকো, আমি এক দৌড়ে আনিস ডাঃ কে নিয়ে আসছি। বাবা তার শিরা ওঠা কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে আমার হাত ধরে টেনে রাখে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার মুখের দিকে। সে দৃষ্টিতে পিতার প্রগাঢ় মমতা, বিদায়ের সুর, ইশারার অর্থ, তুমি নড়োনা। এরপর খুব শান্তভাবে প্রস্থান করে।
হতভম্ভ আমি স্থাণুবৎ বসে থাকি।

(৪)
সময়ের পালতোলা নৌকায় দিন মাস বছর চলে যায়। কার, কিভাবে যায় সেটাই নিগুঢ় বাস্তবতা। যেভাবেই হোক বকুলও প্রতিটি আগামীকাল পেরিয়ে নিজের লেখাপড়াটা করে যায়।
ওর অনার্স ফাইনাল শেষ। সব গুছিয়ে নিয়ে সে ষ্টেশনে এসেছে। লাগেজ উপরের র‍্যাকে তুলে দিয়ে জানালার পাশে বসে পড়ে। জানালার পাশে সিট না হলে ওর মন খারাপ হয়। আজ ভাগ্য সুপ্রসন্ন, মনে করার চেষ্টা করে সকালে ক’টা শালিক দেখেছিল! সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলেছে গাড়ী আর পেছনে একে একে চলে যাচ্ছে হাইরাইজ বিল্ডিং, লাইন সংলগ্ন ঝুপড়িঘর, বাজার,  বস্তিবাসী মানুষ, এরপর সবুজ ক্ষেতে কাকতাড়ুয়া, শালবন, পুকুর, গরু ছাগল…মাঝে মাঝেই সফেদ কাশবন…
ব্যাগের ভেতরে বাজনা বেজে উঠলো টুং, মোবাইল মেসেজ। ইচ্ছে করলনা এখন মোবাইল ঘাটতে। বরং ছুটে যাওয়া নৈশর্গিক দৃশ্য দেখতে ভাল লাগছে। আশ্বিনের আকাশ নীল সাদার অসীম এক ক্যানভাস।

সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। সে ব্যাগ থেকে জেলি আর পাউরুটি বের করে নাস্তা খেয়ে, ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে নিয়ে মোবাইল হাতে নেয়। নাহ ইনবক্সে কোন মেসেজ নেই, তবে আদারবক্সে কি একটা আছে, আদার বক্সে গিয়ে সে ফ্রিজ হয়ে যায়। ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। হাতের চা কোথায় রাখবে কি করবে দিশা থাকেনা। চা ফেলে দুই হাতে মোবাইল নিয়ে ভালোভাবে দেখে
নাহ, কোন ভুল নেই। রেহান ভাই। নাম ঠিকাছে। প্রোপিকে কিছু শিউলি ফুলের ছবি। দ্রুত প্রোফাইলে চলে যায়, কভারে অতি পরিচিত শিউলিগাছ সহ বাড়ির সামনের ছবি। সব মিলে গেছে। লিখেছে-
-বকুলফুল! কেমন আছ?
বকুলের হাত কাঁপতে লাগলো। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। ভাবলো লিখবে ‘ভালো আছি’ আবার ভাবলো লিখবে ‘তুমি! তুমি এতদিন কোথায় ছিলে রেহান দা’ ‘তুমি কেমন আছ’ তিনটে বাক্য একসাথে মাথায় হুড়মুড়িয়ে এলো, আঙুলে কোনটি আসবে ঠিক করতে পারেনা। ভাবতে আর লিখতে গিয়ে সব এলোমেলো হয়ে যায়। ট্রেনের দুলুনি, বুকের ধরফর, হাতের কাঁপনে কিচ্ছু লিখতে না পেরে সে দুহাতে মুখ ঢেকে ব্যাকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে।

এত বছর ধরে যাকে প্রতিটি পল অনুপল খুঁজেছে, একি আসলেই রেহান দা! নাকি ভুল! না, না ভুল নয়, ভুল নয়। রেহান দাই। এই ছবি আর কার কাছে থাকা সম্ভব! সারাপথ সে কখনও কাঁদল, কখনও আতংকিত হয়ে ভাবলো কিছু একটা ভুল হচ্ছে, রেহান দা তো হারিয়ে গেছে। হারানো মানুষ কি আর খুঁজে পাওয়া যায়!  ভার্সিটি লাইফে খুব ঘনিষ্ট বন্ধু জানত বকুলের হৃদয়ের মানুষ দেশের বাইরে থাকে। এই কয়েক বছরে অজস্রবার ওর কানে গরম সীসা ঢেলেছে একটি যান্ত্রিক বাক্য ‘দ্যা নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়াল্ড ক্যাননট রিচড এট দা মোমেন্ট’।
ঘটমান বর্তমানকে পেটের ভেতরে নিয়ে ট্রেন ছুটতে থাকে অজানা ভবিষ্যতের দিকে। ট্রেনের সাউন্ড সিস্টেমে অদিতি মহসিনের আকুল আকুতি ঝরতে থাকে-“ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমারে যবে পাই দেখিতে, হারাই হারাই সদা ভয় হয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে”…

বাড়িতে পৌঁছে সে মাকে জানালো-
-মা আমি ঘুমাব কেউ যেন বিরক্ত না করে।
-আচ্ছা বাবা ঘুমা। তবে গোসল সেরে খেয়ে ঘুমাতি। আর শোন একটা খবর… মায়ের কথা শেষ হবার আগেই সে দরজা লাগিয়ে দেয়। মায়ের কথাটা শুনলে হয়ত…
ব্যাগ থেকে ফোন বের করে, এবার সে মেসেজের উত্তর দেবে। দেখে আবার একটি মেসেজ এসেছে, “শিউলি কুঁড়াতে আসবা কি”?
মানে! এক লাফে জানালার কাছে গিয়ে পর্দা তুলে দেখে ওবাড়ির বাতায়নের পর্দা বিদিশা বাতাসে উড়ছে। বকুল নিজের সকল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। পেজা তুলোর ওজনহীন অস্তিত্ব নীলাকাশে উড়তে থাকে। অনুভূতির এক প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে যেতে-
দৌড় দিতে দিতে চেঁচিয়ে বলে-
-মা আমি রেহান ভাইয়াদের বাসায় গেলাম…
মা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। মৃদু হাসি নিয়ে মেয়ের গমন পথে তাকিয়ে থাকে। যদিও দু এক জায়গায় টুকটাক মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে কিন্তু মাতো

মেয়ের অন্তরের খবর জানে। মায়ের চোখ সজল হয়ে ওঠে। সজল চোখে কেবল ডানামেলা এক প্রজাপতির উড়ে যাওয়া দেখে।
দূরে কোথায় পুজার ঢোল বেজে ওঠে।

-কাজী লাবণ্য

Add Comment

Click here to post a comment

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

June 2024
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930