রকমারি

হেমন্ত আসে হিম কুয়াশার চাদর নিয়ে

হ্যালোডেস্ক

শরতের শাদা কাশকুল ও স্নিগ্ধ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে হেমন্ত আসে হিম কুয়াশার চাদর নিয়ে। প্রকৃতিজুড়ে নতুন আবহ তৈরি হয় এ সময়। শিশিরস্নাত সকাল, কাঁচাসোনা রোদমাখা স্নিগ্ধসৌম্য দুপুর, পাখির কলকাকলি ভরা ভেজা সন্ধ্যা আর মেঘমুক্ত আকাশে জ্যোৎস্না ডুবানো আলোকিত রাত হেমন্তকে আরো রহস্যময় করে তোলে সবার চোখে; প্রকৃতিতে এনে দেয় ভিন্নমাত্রা। হেমন্তের এই মৌনতাকে ছাপিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নবান্ন প্রবেশ করে জাগরণের গান হয়ে, মানুষের জীবনে এনে দেয় উৎসবের ছোঁয়া। নবান্ন মানেই চার দিকে পাকা ধানের ম-ম গন্ধ, নতুন অন্ন, গ্রামের মাঠে মাঠে চলে ধান কাটার ধুম, হেমন্তে এই ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। গৃহস্থবাড়িতে নতুন ধানে তৈরি পিঠাপুলির সুগন্ধ বাতাসে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে হেমন্তের এ শাশ্বত রূপ চিরকালীন। গ্রামবাংলার এই নির্মল আনন্দে সৃষ্টির উল্লাসে শামিল হন কবিরাও। তাই নবান্নের খালি মাঠে বালিহাঁসের পড়ে থাকা ধান খুটে খুটে খাওয়ার মতো হেমন্তের মাঠে মাঠে কবিতার পঙ্ক্তিমালা খুঁজে বেড়ানোর প্রয়াস পাবো আজ।

সাহিত্যের প্রাচীন যুগে বৌদ্ধ সহজিয়ারা রচিত চর্যাপদে কোনো ঋতুরই উপস্থিতি সরাসরি নেই। তবে মধ্যযুগের কবি কংকন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত ‘কালকেতু’ উপাখ্যানে হেমন্তের সামান্য নমুনা পরিদৃষ্ট হয়। কবির ভাষায়- ‘কার্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ/যগজনে করে শীত নিবারণ বাস।’ মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলিতে হেমন্তের নতুন ধান্যে কৃষকের ঘরে ঘরে সুখের আবেশ ছড়ায়। এ সময়ে তারা পরম তৃপ্তিতে সুখস্মৃতি নিয়ে আনন্দ বিলাসে মেতে ওঠে। বৈষ্ণব পদকর্তা লোচনদাসের পদে তার সমর্থন পাওয়া যায়- ‘অগ্রাণে নোতুন ধান্য কৃষি প্রধান বাংলাদেশের কৃষক, কৃষিপণ্য, কৃষকের জীবনাচরণ আধুনিক বাংলা কাব্যের একটি বড় অনুষঙ্গ। এ কারণে এ দেশের প্রায় সব কবি সাহিত্যিকের রচনায় কোনো না কোনোভাবে হেমন্ত ঋতুর প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষত বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমন্ত ঋতু নিয়ে অজস্র কবিতা ও গান রচনা করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদদীন, সুফিয়া কামাল, সুধীন দত্ত, বিষ্ণুদে, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের কাব্যে হেমন্ত ঋতু অসাধারণ চিত্রকল্পে পাঠক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ মূলত ভাববাদী। তার এই ভাববাদ প্রেম, পূজা পর্বের মতো প্রকৃতি, নিসর্গ ও ঋতুচক্রেও স্পষ্ট। তিনি ঋতুর ভেতর নানা রঙ ও বর্ণের খেলা যেমন লক্ষ্য করেছেন, তেমনি দেখেছেন প্রকৃতির লীলালাস্যও। তার একটি বিখ্যাত গানের নাম ‘হিমের রাতে’। গানটিতে তিনি বলেছেন, ‘হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে,/হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে।/ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো/দীপালিকায় জ্বালাও আলো,/জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’ অর্থাৎ হেমন্তের আগমনে প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। রাতে তারার আলোয় হেমন্তের মৃদু কুয়াশায় আড়াল হয়ে গেছে। তবে ঘরে ঘরে আহ্বান এসেছে, আলো জ্বালানোর।

হেমন্ত প্রকৃতিতে গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে পল্লী কবি খ্যাত জসীমউদদীনের কবিতায়। এ সময়ে মাঠে মাঠে পড়ে থাকে হলুদ পাকা ধান। কৃষাণ-কৃষাণীর ব্যস্ততা পাকা ধান ঘরে তোলার। পাকা ধানের ম-ম গন্ধ ছড়ায় চার দিক। এ সময়ে বৃক্ষশাখা থেকে ফুল-পাতা ঝরে পড়ে। কিছু দিন চলে প্রকৃতিতে শূন্যতা ও রিক্ততার প্রকাশ। তিনি বলেন, ‘আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান,/সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।/ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়ায় বায়ু/কলমি লতায় দোলন লেগেছে, ফুরাল ফুলের আয়ু।’

হেমন্তপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশ। তার কবিতায় হেমন্ত, প্রকৃতি আর আত্মমগ্ন একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

তার অজস্র কবিতায় ধূমল কুয়াসাচ্ছন্ন হেমন্ত প্রকৃতি অন্তরঙ্গ অনুভবের সংশ্লিষ্টতায় অপূর্ব বাণীমূর্তি রূপে উদ্ভাসিত হয়েছে। হেমন্ত তার প্রিয় ঋতু। অপূর্ব কাব্যিক সুষমায় হেমন্ত তার তুলির আঁচড়ে ব্যঙময় রূপে ধরা দিয়েছে। আর কোনো কবির কাব্যে হেমন্ত তার মতো রূপক, উপমা অলঙ্কার, নব নব শব্দের বিনুনিতে এত অনবদ্য প্রকাশ চোখে পড়ে না। হেমন্ত তার চোখে কেবল রূপসজ্জা ও সৌন্দর্যের জৌলুশ মাত্র নয়, কবি হেমন্তকে দেখেছেন প্রেমে-কামে, দেহে-দেহহীনতায়, সৃষ্টিতে, তৃপ্তিতে, বিরহে, বিরতিতে। হেমন্ত তার কাছে প্রেম বিরহ মিলন ও সৃষ্টির এক অপার বিস্ময়। ‘পিপাসার গান’ কবিতায় লিখেছেন- ‘এ দেহ অলস মেয়ে/পুরুষের সোহাগে অবশ/চুমে লয় রৌদ্রের রস/হেমন্ত বৈকালে/উড়ো পাখপাখালির পালে/উঠানের পেতে থাকে কান, শোনে ঝরা শিশিরের ঘ্রাণ/অঘ্রাণের মাঝরাতে।’ হেমন্ত রাতের নৈঃশব্দ্য স্পষ্ট করার জন্য কবি ঘ্রাণ শক্তির সঙ্গে শ্রবণ শক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তার কবিতায় হেমন্তের কিছু অনুষঙ্গের ব্যবহার এতো সুপ্রচুর যে, তাকে হেমন্তের কবি বলে আখ্যায়িত করলেও ভুল হবে না। ‘ধান কাটা’, ‘নবান্ন’, ‘ইঁদুর’, ‘শালিক’, ‘লক্ষ্মীপেঁচা’, ‘নির্জন স্বাক্ষর’, ‘কার্তিকের নীল কুয়াশায়’, ‘শামুক গুগলিগুলো প’ড়ে আছে শ্যাওলার মলিন সবুজে’, ‘হেমন্ত এসেছে তবু’, ‘অঘ্রাণের প্রান্তরে’, ‘প্রচুর শস্যের গন্ধ বুকে তার থেকে আসিতেছে ভেসে/পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাঁড়ারের দেশ’, ‘হেমন্তের রৌদ্রের মতন/ফসলের স্তন/আঙুলে নিঙাড়ি’র এমন কিছু শব্দ, শব্দবন্ধ, বাক্যাংশ, বাক্য জীবনানন্দ দাশের হেমন্তপ্রেমী সত্তার পূর্ণ বিকিরণ ঘটিয়েছে।


হেমন্তের আগমনে শিশির সন্ধ্যায় শিরশির হিমেল অনুভূতি আসন্ন শীতের বার্তা বয়ে আনে। শস্যহীন রিক্ত মাঠ, বৃক্ষ শাখা থেকে হলুদাভাব চ্যুত পত্রের স্তূপ। এ সময়ে বিরাণ মরুভূমির মতো চার দিকে নিষ্প্র্রভ জীবনের নৈরাশ্য ধ্বনি উত্থিত হতে থাকে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় প্রকৃতির এই রিক্ততা ও শূন্যতার চিত্রই ফুটে ওঠে- ‘ধূমায়িত রিক্ত মাঠ, গিরিতট হেমন্ত লোহিত/তরুণ তরুণী শূন্য বনবীথি চ্যুত পত্রে ঢাকা,/শৈবালিত স্তব্ধ হ্রদ, নিশাক্রান্ত বিষণ্ণ বলাকা/ম্লান চেতনারে মোর আকস্মাৎ করেছে মোহিত।’

পল্লী বাংলার লোকায়িত জীবন ও তার শ্যামল রূপ ঐশ্বর্য আল মাহমুদের কবিতায় ফুটে উঠেছে। তার প্রকৃতি কখন কখন দেহজ কামনা বাসনায় অপূর্ব নারী মূর্তি রূপে আকর্ষণ করেছে সান্নিধ্য পাওয়ার আকাক্সক্ষায়। তার কব্যে প্রেম প্রকৃতি সৌন্দর্য ও নারী অভিন্ন সত্তার একাকার হয়ে মিশে আছে। কবির কথায়- ‘আজ এই হেমন্তের জলজ বাতাসে/আমার হৃদয় মন মানুষীর গন্ধে ভরে গেছে/রমণীর প্রেম আর লবণ সৌরভে/আমার অহংবোধ ব্যর্থ আত্মতুষ্টির ওপর/বসায় মার্চের দাগ, লাল কালো কট ও কষায়।’

মাঠে মাঠে ছড়ানো সোনালি ধানের প্রাচুর্য হেমন্ত লক্ষ্মীর সুপ্রসন্ন দৃষ্টির প্রকাশ হলেও মাঝে মাঝে কৃষাণ-কৃষাণী সর্বস্বান্তও হয়ে পড়ে। এক দিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, বন্যায় ভেসে যায় ফসলের মাঠে আবার কখনো মহাজনী শোষণে নিঃস্ব হতে থাকে কৃষকের জীবন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে কৃষকের জীবন, অনিকেত দুঃসহ বেদনা ভার তাদের দিশেহারা করে তোলে।

 

ফেসবুক পেজ

আর্কাইভ

ক্যালেন্ডার

June 2024
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930